১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১১:৩৮ এএম
আগামীকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুবার্ষিকী । ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি তার কলকাতার চৌরঙ্গী রোডস্থ ৫৩ নম্বর বাড়িতে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে নবাব সলিমুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। ১৬ জানুয়ারি বিকেল ৪টায় কলকাতায় আলিয়া মাদরাসা সংলগ্ন ওয়েলসলি স্কয়ার পার্কে তাঁর জানাজা নামাজ শেষে ১৭ জানুয়ারি নবাব সলিমুল্লাহর লাশ ঢাকায় আনা হয়। ঢাকায় দুটি জানাজা শেষে নবাবকে দাফন করা হয় বেগমবাজারে পারিবারিক গোরস্তানে। নবাবের আকস্মিক মৃত্যু গবেষকদের কাছে আজও রহস্যে ঘেরা। আমাদের আত্মপরিচয় উদঘাটনের প্রয়োজনে নবাব সলিমুল্লাহকে সামনে আনা দরকার ।
পূর্ব বাংলার মানুষের উন্নতিকল্পে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যে তিনজন মনীষীর অবদান সবচেয়ে বেশি তারা হলেন নবাব সলিমুল্লাহ,ধনবাড়ীর জমিদার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ও শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক । ১৯১১ সালে ২৯ আগস্ট ঢাকার কার্জন হলে ল্যান্সলট হেয়ারের বিদায় এবং চার্লস বেইলির যোগদান উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পৃথক দুটি মানপত্রে নবাব সলিমুল্লাহ ও নওয়াব আলী চৌধুরী ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জের ঢাকায় অবস্থানকালে নওয়াব সলিমুল্লাহ ও নওয়াব আলীসহ ১৯ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে মুসলমানদের যে সমূহ ক্ষতি হচ্ছে সে কথা তুলে ধরেন। এ লক্ষ্যে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট নাথান কমিটি গঠিত হলে নওয়াব আলী চৌধুরী এর অন্যতম সদস্য হন।
১৯২০ সালের মার্চ ১৮ ভারতীয় আইনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল অ্যাক্টে পরিণত হয় এবং ২৩ মার্চ তা গভর্নর জেনারেলের অনুমোদন লাভ করে। লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নয় বছর পর ১৯২১ সালের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যথারীতি ক্লাস শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে অর্থাভাব দেখা গেলে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী নিজ জমিদারীর একাংশ বন্ধক রেখে এককালীন ৩৫,০০০ টাকা প্রদান করেন। অধ্যাপক আবদুল গফুর লিখেছেন:শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কলিকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীরাই নন, খোদ ঢাকা শহরের নেতৃস্থানীয় হিন্দুরাও সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আন্দোলনে মেতে উঠে ছিলেন। ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারী লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা প্রদান করায় এখানকার হিন্দু আইনজীবীগণ ১৯১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী ও ১০ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বার লাইব্রেরীতে পর পর দুটি প্রতিবাদ সভা করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। এসব প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন বাবু ত্রৈলোক্যনাথ বসু। এসব সভায় গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিক্ষার অবনতি হবে। তাই প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন প্রয়োজন নেই।বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তারা বহুদিন পর্যন্ত ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে উপহাস করতেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নবাব সলিমুল্লাহর কোনো অবদান নেই এবং তিনি কোনো জমি দিয়ে জাননি, এমন একটি প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে । এর পিছনে কলকাঠি ঘুরাচ্ছেন কিছু হিন্দু ও হিন্দু প্রভাবিত কমিউনিস্ট । এরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম পরিচিতি মুছে ফেলতে তৎপর । এভাবেই তারা নবাবের চরিত্র হরণ করছে;কারণ তিনি কলকাতার এলিট ব্রাহ্মণদের সঙ্গে লড়াই করে বাঙালি মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন । এই অপরাধে সেকালের হিন্দু মিডিয়া নবাবের চরিত্র হননের চেষ্টা করেছেন । তাকে ব্রিটিশের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন । মজার ব্যাপার হলো কলকাতার ব্রাহ্মণরা ব্রিটিশের দালালিতে কারও চেয়ে কম ছিলেন না । ইতিহাসে এর অসংখ্য নজির রয়েছে । নবাব সলিমুল্লাহ যেহেতু বাঙালি মুসলমানদের স্বার্থ দেখার চেষ্টা করেছিলেন সেই কারণে তাকে সাম্প্রদায়িক বলা হয়েছিল । সেই অপরাজনীতি আজও বহাল তবিয়তে আছে । সেই কলকাতার ভাব সন্তানরা আজ প্রচার করছে, নবাব সলিমুল্লাহ নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় কোনো ভূমিকা রাখেননি এবং জমি দেননি ।
এটা ঠিক যে ছয়শ একর জমি দানের ঘটনাটি সম্পূর্ণ সঠিক নয় কিন্তু একেবারেই দেননি এটাও সঠিক নয় । শাহবাগ বাগানবাড়ি যেটা মধুর কেন্টিন নামে পরিচিত, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান,কলা ভবন, জাদুঘর,চারুকলা, ঢাবির লাইব্রেরি, কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি, ব্রিটিশ কাউন্সিল,পারমানবিক শক্তি কমিশন, শাহবাগের সাবেক পিজি হাসপাতাল,বাংলা একাডেমীর জায়গাটা নবাবদের সম্পদ ছিলো । এখনও সলিমাবাদ মৌজার নামে এর খাজনা পরিশোধ করা হয় । আমরা যে কত আত্মবিস্মৃত ও অকৃতজ্ঞ তার প্রমাণ হচ্ছে এ সমস্ত নোংরা প্রচারণা । বাংলানামা সংকলনে এর বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে । বইটি সংগ্রহ করতে যোগাযোগ : ০১৭৪৬৬২২৮৪