১০ জানুয়ারি, ২০২৪ ১৪:৫৪ পি এম
অনেক দিন আগের কথা। ইগর নামে এক ছোট্ট ছেলে তার মা-বাবার সঙ্গে কাঠের তৈরি ছোট বাড়িতে বসবাস করত। ইগরের পরিবার ছিল খুবই দরিদ্র। তার বাবা কাঠমিস্ত্রি। তার মা শহরের ধনী লোকদের জন্য পোশাক তৈরি করতেন। তাদের বাড়িটি ছিল রাশিয়ার উত্তরে অবস্থিত একটি বিশাল বনের মাঝখানে। গ্রীষ্মের দিনগুলো ছিল দীর্ঘ। তখন পাখিদের গানের মনমাতানো সুরে বন ছিল প্রাণবন্ত। ইগরের বাবা তাকে বিভিন্ন পাখির নাম শিখিয়েছিলেন। সে খুব দ্রুতই পাখিদের ভাষা শিখে ফেলে। পাখিদের গান বুঝতে শেখে।
গ্রীষ্ম পেরিয়ে শীতকাল এলো। দিন ছোট হয়ে গেল। তখন সর্বত্রই গভীর তুষারপাতে ছেয়ে থাকত। বন শান্ত হয়ে গেল। কারণ পাখিরা শীতের মাসগুলোতে বসবাসের জন্য উষ্ণ দেশে চলে যায়। এসব পাখিগুলোকে আমরা পরিযায়ী পাখি বলি।
শীতের এক রাতে ইগর অসুস্থ হয়ে পড়ল। তার মা তার জন্য বিশেষ খাবার ও পানীয় তৈরি করলেন। কিন্তু তার শরীর আরও খারাপ হয়ে গেল। শহরের ডাক্তার ইগরকে দেখতে আসেন। ডাক্তার তার সঙ্গে কথা বলে কিছু সময় কাটান এবং তার কাছে শারীরিক অসুস্থতার কথা জানতে চান। তারপরে তিনি ইগরের মা ও বাবার সঙ্গে কথা বলেন। ডাক্তার বলেন, “সে খুব অসুস্থ। আমি বুঝতে পারছি না- তার কী হয়েছে? এই শীতে সারা দেশে বহু শিশু অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে। তার কারণও জানা যাচ্ছে না। আমি দুঃখিত যে, আমি কোনো সাহায্য করতে পারছি না। তবে তাকে ভাল খাবার খেতে দিন এবং সে যেন পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারে সেটা নিশ্চিত করুন।”
পরের কয়েক দিনের মধ্যে ইগরের শরীরের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল। সে সারাদিন বিছানায় সময় কাটায়। খেলনার প্রতিও সে বিরক্ত হয়ে পড়ে। তার বাবা তাকে জঙ্গল থেকে ছোট ছোট জিনিস এনে দিতেন যাতে সে তার অসুস্থতা ভুলে থাকতে পারে। কিন্তু সে কোনো কিছুতেই আগ্রহী ছিল না। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। দিনে দিনে খাবারেও অরুচি চলে এল। কখনও কখনও রাতে তার জ্বর হয়। জ্বরের ঘোরে সে স্বপ্নে দেখে- সে বনের উপর দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। বনের পাখিরা তার সঙ্গে উড়ছে। আর নীচে তাদের ছোট্ট ঘরটি দেখা যাচ্ছে।
এভাবে খুব খারাপ একটি রাত অতিবাহিত হলো। পরদিন সকালে ইগর জেগে ওঠে এবং দেখতে পায় তার বাবা তার দিকে তাকিয়ে আছে।
‘তুমি কি কিছু চাও, যা আমি তোমার জন্য এনে দিতে পারি?’ তার বাবা বললেন।
‘হ্যাঁ বাবা,’ বলল ইগর। ‘আমি পাখির গান খুব মিস করছি। তুমি কি একটা পাখি আমার জন্য খাঁচায় এনে রাখতে পারো? খাঁচাটা আমার বিছানার উপরে রাখলে আমি পাখির গান শুনতে পারব এবং বনের শব্দ অনুভব করতে পারব।
‘অবশ্যই, ইগর,’ তার বাবা হাসতে হাসতে বললেন। ‘আমি আগামীকাল তোমার জন্য পাখি নিয়ে আসব।’
কিন্তু তিনি (ইগরের বাবা) জানতেন, এখন শীতকাল, বনে পাখি নেই। এই একটা জিনিসই তার ছেলে চেয়েছিল এবং তিনি তাকে দিতে পারছে না।
‘তুমি তাকে কাঠ দিয়ে পাখি বানিয়ে দিতে পারো?’ বলল ইগরের মা। ‘আমরা যেসব কাঠ আগুনে পুড়াই, সেই কাঠের টুকরোগুলো দিয়ে আপনি একটি পাখি বানাতে পারেন।’
প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ও তুষারময় দিন। এসময় বনের গাছ কাটা কঠিন। ইগরের বাবা কীভাবে তার ছেলেকে কাঠের পাখি তৈরি করবেন সারাদিন কাজের ফাঁকে তা নিয়ে ভাবতেন থাকেন। তিনি মনে মনে চিন্তা করলেন- ‘এ পাখি নিশ্চিত কখনই গান গাইবে না।’ তিনি নিজেকে আবার বললেন, ‘তবে এটি দেখতে খুব সুন্দর হলে ছোট্ট ইগরও এটি পছন্দ করবে।'
রাতে খাওয়ার পর ইগরের বাবা পাখি বানানো শুরু করেন। প্রথম কয়েকবার তিনি চেষ্টা করেন। কিন্তু ভাল হচ্ছিল না। কোনটা খুব মোটা হয়ে যাচ্ছিল। আবার কোনটা খুবই ভারী। তিনি খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। চিন্তা করতে করতে মধ্যরাত হয়ে এলো। বাইরে প্রচণ্ড তুষারপাত হচ্ছে। হঠাৎ তিনি মনে মনে বললেন, ‘পাখি বানাতে মাত্র দুটি কাঠের টুকরা যথেষ্ট। সাবধানে কাঠ কাটলে পাখির আসল পালক বানানো সম্ভব।’ প্রথমে তিনি মাথা, শরীর ও লেজের জন্য এক টুকরো কাঠ নিলেন। তিনি লেজ বানানো শুরু করলেন, ডান হাত দিয়ে কাঠের পালক কাটলেন। তারপর বাম হাত দিয়ে পালকগুলো মসৃণ করলেন। লেজ বানানো হলে তিনি ডানার জন্য আরও কিছু কাঠ নিলেন। তিনি সাবধানে সেগুলো কেটে ফেললেন। এতে অনেক সময় লেগে গেল। কারণ কখনও কখনও পালক ভেঙে যায়। আবার নতুন করে শুরু করতে হয়। অবশেষে তিনি পাখি বানানো শেষ করলেন। সূর্য উঠতে শুরু করার সময় তিনি তার স্ত্রীকে পাখিটি দেখালেন।
‘এটা খুবই সুন্দর,’ স্ত্রী বললেন। ‘তবে এটি এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি।’
তিনি একটি সুই ও কিছু সুতো নিলেন। সাবধানে লেজের পালক ও ডানার পালকের প্রান্তে সুতো সেলাই করে দিলেন। পালক দুটি সত্যিকারের পাখির মতোই মনে হলো। তারপর পাখির পিঠের মাঝখানে একটা লম্বা সুতো বেঁধে দিলেন। যাতে তারা এটিকে ইগরের বিছানার উপরে ঝুলিয়ে রাখতে পারেন। তারা একসাথে পাখির দিকে তাকালেন।
‘এখন এটি প্রস্তুত। আমি এটিকে ইগরের ঘরে নিয়ে যাচ্ছি,’ কাঠমিস্ত্রি বললেন।
ইগর ঘুমিয়ে ছিল। নিঃশব্দে বাবা পাখিটিকে ছেলের বিছানায় ঝুলিয়ে দিলেন। তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে সেদিকে একবার তাকালেন। পাখিটি সুতোয় ঝুলে ধীরে ধীরে ঘুরছে। কাঠমিস্ত্রি তার দীর্ঘ রাতের পরিশ্রমের পর বিশ্রাম নিতে খুশি মনে বিছানায় গেলেন।
সকালে তিনি ইগরের ঘরে যান। পাখিটি ধীরে ধীরে ইগরের মাথার উপরে ঘুরছিল। তার ছেলে পাখিটিকে মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রথমবারের মতো তার চোখে আলো ঝলমল করছিল।
‘এটা খুবই সুন্দর, বাবা,’ ইগর বলল। ‘ধন্যবাদ। কিন্তু বাবা, বনে এরকম পাখি আগে দেখিনি। এর নাম কী?’
‘এটা একটা ভালো প্রশ্ন। আমি খোঁজ নিয়ে পরে জানাব,’ বললেন বাবা।
পরের দিন সকালে কাঠমিস্ত্রি যখন তার ছেলের ঘরে গেলেন তখন দেখলেন, ছেলেটি বিছানায় বসে পাখিটিকে স্পর্শ করার চেষ্টা করছে। তিনি ভাবছিলেন, ‘সর্বশেষ কয়েক সপ্তাহ আগে ইগর বিছানা থেকে উঠেছিল।’
‘তাহলে এর নাম কী, বাবা?’ ছেলে পুনরায় জিজ্ঞেস করল।
‘আমি এখনও নিশ্চিত নই,’ তার বাবা উত্তর দিলেন।
সেই রাতে ইগরের বাবা তার ছেলের ঘরে গেলেন এবং তিনি চুপিচুপি সুতাটি একটু ছোট করলেন। এখন পাখিটি ইগরের মাথার একটু উপরে ঝুলছিল। তিন দিন পরে তিনি ইগরকে বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসে পাখিটিকে স্পর্শ করার চেষ্টা করতে দেখেন। তার হাত পাখিটির খুব কাছেই ছিল।
‘তুমি কি আমার পাখির নাম ঠিক করেছ বাবা?’ ইগর জিজ্ঞেস করল।
‘এখনও না, আমার ছোট্ট ছেলে। আমি তোমাকে পরে বলব,’ তার বাবা জবাব দিলেন।
বাবা রাতে আবার ছেলের ঘরে গিয়ে পাখিটিকে একটু উঁচু করে রাখলেন।
পাঁচ দিন পর ইগর বিছানায় দাঁড়িয়ে প্রায় পাখিটিকে স্পর্শ করছিল।
‘বাবা, আমাকে সাহায্য করো। আমি পাখিটাকে স্পর্শ করতে চাই,' সে বলল।
‘তুমি চেষ্টা করো। তুমি যতটা ভাবছ ততটা উঁচু নয়,’ বললেন তার বাবা।
‘আর কবে পাখিটার নাম বলবে?’
‘খুব শীঘ্রই, আমার ছেলে,’ বাবা উত্তর দিলেন।
সাত দিন পরে ইগরের বাবা কাঠ কাটছিলেন তখন তিনি শুনতে পেলেন বাড়ি থেকে অদ্ভুত শব্দ আসছে। দ্রুত দৌঁড়ে ছেলের বেডরুমে গেলেন। ইগর তার বিছানায় লাফিয়ে লাফিয়ে হাসছিল। তার মাথার ওপর দিয়ে পাখিটা খুব দ্রুত ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
‘দেখ বাবা। আমি পাখিটিকে ছুঁয়েছি!’ ইগর খুশিতে চিৎকার দিয়ে উঠল। ‘এখন, আমাকে বলো। এটার নাম কী?'
‘এর নাম সুখ পাখি,’ তার বাবা উত্তর দিলেন। আর তার মা দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলেকে আনন্দিত দেখে হাসলেন।