২৫ অগাস্ট, ২০২৬ ১২:৫৭ পি এম
‘জুলাই মানে মুক্তি’ সত্যিই কি তাই? জুলাই কি মুক্তির আরেক নাম? জুলাই আমাদেরকে কী হতে মুক্তি দিয়েছিলো? মাত্র চব্বিশ মাস আগের বাংলাদেশ। যেখানে দুর্নীতি ছিলো নীতি, সন্ত্রাস ছিলো সাধুতা, ক্ষমতা ছিলো সত্যবাণীর একমাত্র উৎস। সহসা বাংলাদেশে স্বর্গীয় দূত রূপে আগমন করে জুলাই। জুলাই আসে আমাদের মাঝে মুক্তির বার্তা নিয়ে, স্বাধীনতার শাশ্বত বাণী নিয়ে। তাই আমরা মনে করি জুলাই মানে সত্যিই মুক্তি।
কুমিল্লার সন্তান আরিফ হোসেন সবুজ। তার কবিতা পড়লে মনে হয় সে কেবলই সবুজ নয়, সে যেন লাল সবুজ। গত শতাব্দীর শেষ লগ্নে জন্ম নেয়া সবুজের বেড়ে উঠা এ শতকের শুরুতে। একবিংশ শতাব্দীর সিকি সময়ে তিনি বাংলাদেশ ও বিশ্বকে পরখ করেছের ঘন একনিষ্ঠতায়। বিশেষত এ দেশের মানুষের বঞ্চনার আর্তি, অপ্রাপ্তির হাহাকার, ছাত্রসমাজের আর্তনাদ, আগত সম্ভাবনার অকাল বিনাশ, যোগ্যতার নীরব চিৎকার। কবি আরিফ হোসেন সবুজের জন্ম সন বলে দেয়-এ দেশের আকাশেও যে শান্তি-সুখের কপোত উড়ে সে দৃশ্য তার বড় বেশি দেখা হয়নি। গাজার শিশুরা প্রতিদিন বোম্বিং দেখে, চোখের সামনে হননের নারকীয় দৃশ্য দেখে, বসত উচ্ছেদের গাঢ় শব্দে তাদের নিঁদ ভাঙে। কবি আরিফ হোসেন সবুজ এমন দৃশ্যের সাথে পরিচিত না হলেও প্রাণবন্ত একজন মানুষের অকস্মাৎ হারিয়ে যাবার সংবাদ, যোগ্যতর কোনো প্রার্থীর চাকুরি বঞ্চিত হবার খবর, নিরপরাধীর শাস্তি ভোগের কাহিনি, দমন ভীতিতে পালিয়ে থাকবার সংবাদ সে শুনেছে প্রতিনিয়ত। অহরহ প্রত্যক্ষ করেছে এ সবের দৃশ্য।
কবি আরিফ হোসেন সবুজ রাজনীতিক নন। তবে নিঃসন্দেহে তিনি রাজনীতি সচেতন মানুষ। তার লিখা বাকশাল থেকে স্বৈরাচার গ্রন্থ শিরোনাম আমাদেরকে সে কথার নিশ্চিত জানান দেয়। সে তো জেনারেশন জি-এর প্রোজ্জ্বল প্রতিভূ। জুলাই চব্বিশের লড়াকু সৈনিক। আন্দোলনের সাথে একাত্ম থেকে, সংগ্রামীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একাকার হয়ে যান মুক্তির অন্বেষায়, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায়।
কবি আরিফ হোসেন সবুজের তৃতীয় গ্রন্থ ‘জুলাই মানে মুক্তি’। এটি একটি কবিতার বই। আরো একটু এগিয়ে বলা যায়—এটি মূলত ছড়ার বই। হাতে গোণা কয়েকটি কবিতা ছাড়া প্রায় সবগুলোই ছড়ার ছন্দে গাঁথা। এক স্তবক, দুই স্তবক কিংবা তিন স্তবক। কদাচ চার বা পাঁচ স্তবকের ছড়াও আছে এতে। এ বইয়ের অধিকাংশ ছড়া ঝরঝরে এবং সহজ ছন্দের। যা মুহূর্তেই কিশোর মনে ঝড় তোলে। সহজেই তা আত্মস্থও করে। কবির আবেগী উচ্চারণ-
সাহস নিয়ে আমরা লড়ি
দেশ বাঁচাতে লড়াই করি,
ঘোর আঁধারে পাই না ভয়
রাত পোহালেই সূর্যোদয়।
জাতির মুখে ফুটবে হাসি
রুখব তুফান সর্বনাশী,
শপথ নিলাম উদার দিলে
দেশ সাজাব সবাই মিলে। (সাহস, পৃ.২০)
কবি আরিফ হোসেন সবুজের সাহস কবিতাটি দেশের কিশোর ও তরুণ সমাজের প্রাণে প্রাণে সাহস জোগাবে যুগ হতে যুগান্তরে। তার উচ্ছ্বাস ভরা কবিতা, ছন্দের সারল্য, মাত্রার বিনয় যে-কোনো মানসপটে রেখাপাত করে অতি সহজেই। দুর্বোধ্য ও জটিল ছন্দ কবির একেবারেই অপছন্দের। ছান্দসিক কবি আরিফ হোসেন সবুজ তার ছন্দ সুষমায় খুঁজে ফেরেন জন্মভূমির প্রতি প্রীতিময় আকর্ষণ। অতীব সন্নিকট থেকে প্রত্যক্ষ করা জুলাই আন্দোলন যেন দেশেরই প্রতিচ্ছবি। দেশ ও দেশমাতার প্রতি উদগ্র ভালোবাসা কবির অমর প্রতিশ্রুতি। জুলাই ও জন্মভূমি নিয়ে কবির সোজাসাপ্টা আলাপ-
বাঁচলে জুলাই বাঁচবে তুমি
জুলাই মানে জন্মভূমি। (জন্মভূমি, পৃ. ৩৩)
কী চমৎকার কবির অভিব্যক্তি! এত সংক্ষিপ্ত কথনে এমন মহৎ ভাব প্রকাশ কবির কাব্য সক্ষমতার অনন্য প্রকাশ নিঃসন্দেহে। কাব্যের পরিধি ও শব্দ স্বল্পতা যেন আমাদেরকে কবি হেলাল হাফিজের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কবি আরিফ হোসেন সবুজ তার সাধনা অব্যাহত রাখলে নিকট ভবিষ্যতে সে হেলাল হাফিজকে স্পর্শ করলে অবাক হবার কিছুই থাকবে না।
কবি আরিফ হোসেন সবুজের জুলাই মানে মুক্তি কাব্যগ্রন্থের ছোট-বড়, ছড়া-কবিতা মিলে প্রায় বত্রিশটি শিরোনাম রয়েছে। তার কবিতায় ছন্দের অভিনবত্ব কম থাকলেও জাগৃতির রসদে কোনো কমতি পাওয়া যাবে না। চিরচেনা ছন্দের আবহে জাগরণের তৃষ্ণাকে অর্থবহ করতে কবির প্রয়াসের যেন অন্ত নেই। দেশপ্রেমিক ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত আন্দোলনের ইতিহাস কবি আরিফ হোসেন সবুজকেও আন্দোলিত করে এক নব-মাত্রিকতায়। থোকা থোকা শব্দে জুলাইয়ের ইতিহাস গ্রন্থনায় কবি সদা তৎপর। কবি বলেন-
একটি দেশের বক্ষে এত
ঢালতে হলো রক্ত,
এই ইতিহাস পড়লে মনে
কান্দি দেশের ভক্ত। (রক্তঝরা স্বাধীনতা, পৃ. ৩০)
রক্তের দামে কেনা এই স্বাধীনতাও যেন আজ বিক্রয়ের পণ্য। সর্বস্বীকৃত স্বাধীনতার সনদ যেন আজ ক্রীড়া পণ্য। আক্ষেপের সাথে কবির উচ্চারণ-
যে কারণে দেশটা স্বাধীন
করল দেশের যোদ্ধা,
বাস্তবায়ন হয়নি তো তা
জানে সকল বোদ্ধা। (রক্তঝরা স্বাধীনতা, পৃ. ৩০ )
কিন্ত স্বাধীনতা ও স্বাধিকারকে অক্ষত রাখতে দেশের মানুষ বদ্ধপরিকর। দেশকে মুক্ত না করে যেন তাদের স্বস্তি নেই। স্বৈরাচারের দমন পীড়নে তাদের কোনো শঙ্কা বা ভীতি নেই। স্বৈরাচারের উৎখাতে তারা অদম্য বিক্রমী। কবির সাহসী উচ্চারণ-
পিছু তবু কেউ হটেনি
হলো বরং ক্রুদ্ধ,
লাল জুলাইয়ের জ্বালল আগুন
করল কঠিন যুদ্ধ।
স্বৈরাচারের শেষ পরিণতি ছিলো-
ভয়ে জালিম স্বৈরাচারী
দেশ ছেড়ে তাই ভাগল,
নতুন করে দেশ সাজাতে
জাগল মানুষ জাগল। (রক্তঝরা স্বাধীনতা, পৃ. ৩০)
কোনো বিপ্লব, কোনো স্বাধীনতা আন্দোলন কিংবা আজাদীর সংগ্রাম সফল হয় তাজা খুনের বদলাতে। সাগর পরিমাণ রক্তের বিনিময়ে আসে সংগ্রাম সফলতা। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। কবি আরিফ হোসেন সবুজ এক মুহূর্তের জন্যও ভোলেননি জুলাই শহীদদের। কবিতায় সকলের নাম উচ্চারণ করেননি। তবে স্মরণে রেখেছেন সর্বদা। তিন পঙ্ক্তির ছোট ছড়ায় সামগ্রিকতার আয়োজন করেছেন কবি এভাবে-
একাত্তর ও জুলাই হয়
বুকের তাজা খুনে হয়,
তাবেদারী হইছে শেষ
মাথা উঁচু বাংলাদেশ।
সাঈদ ওয়াসিম মুগ্ধ মীর
বাংলা মায়ের শ্রেষ্ঠ বীর। (জয়, পৃ. ৩৫)
এমনিতরো আরো বেশ কিছু ছড়া আছে যেগুলো প্রমাণ করে কবি আরিফ হোসেন সবুজের ছন্দের সারল্যের মধ্যেই রয়েছে জাগরণের নেশা, দেশ প্রেমের প্রতিজ্ঞা। তাই ছড়াকার আরিফ হোসেন সবুজ দেশের কবি, জাগরণের কবি। তার কাব্য ঢঙে রয়েছে বৈচিত্র্য, ছন্দে রয়েছে বাঙ্ময়তা। জুলাইয়ের মিছিল কবিতায় কবি আরিফ হোসেন সবুজ তার ছন্দমাত্রায় এনেছেন নব-মাত্রিকতা। অন্তমিলকে একটুখানি সরিয়ে রেখেছেন। তবে তাতেও রয়েছে সুরের রেশ। রয়েছে দ্রোহের আগুন। অনিবার্য বিপ্লবাকাঙ্ক্ষার দীপ্ত প্রত্যয়। কবির সুউচ্চ কণ্ঠে শোনা যায়—
এ শহর একদিন কেঁপেছিল গুলির শব্দে
মানুষের বুকে ছিল প্রতিরোধের অগ্নি
মুখে ছিল স্লোগান
কে জানত, একটি মিছিল হয়ে উঠবে আগুনের নদী
নিঃশব্দ মানুষেরাও বজ্রধ্বনি তুলবে রাজপথে। (জুলাইয়ের মিছিল, পৃ. ২১)
বিপ্লবকে অনিবার্য করতে, নিশ্চিত করতে, মা রূপী নারী সমাজের বিপ্লবাকাঙ্ক্ষা সেদিন আরো বেশি ভয়াল রূপে মূর্ত হয়েছিলো। মায়েদের সে উচ্চকণ্ঠ চিৎকার আজো শোনা যায় আকাশে-বাতাসে-ইথারে। কবিতার শেষে কবির দৃপ্ত উচ্চারণ-
আর যে মা শহীদ সন্তানের নিথর মুখ ছুঁয়ে বলেছিলো—
‘এমন আরো হাজারটা সন্তান বিলিয়ে দেবো
মাতৃভূমির জন্য, বিপ্লবের জন্য।’’
সে মায়ের কণ্ঠ আজও শোনা যায়
মিছিলে, রাস্তায় ও বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে। (জুলাইয়ের মিছিল, পৃ. ২১ )
তরুণ কবি আরিফ হোসেন সবুজ কাব্যমাঝে শব্দের ফুলঝুড়ি ছড়িয়েছেন যথাসক্ষমতায়। অবশ্য কদাচ দ্বিরুক্তি বা বাহুল্য ব্যবহার তার কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। যেমন তিনি বলেছেন ‘প্রতিটি ঘরে ঘরে’। এখানে ঘরে ঘরে বা প্রতিটি ঘরে বললেও যথেষ্ট ছিলো। তবে এমনটি বড় বেশি দেখা যায়নি। কিংবা এমন দ্বিরুক্তি জিহ্বা ও কর্ণকে বিরক্তও করেনি।
কবি আরিফ হোসেন সবুজ জুলাইকে বাংলাদেশের মুক্তির স্মারক হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। ইশতেহার বয়ান করেছেন নতুন বিপ্লবের। তিনি মনে করেন রক্তই বিপ্লবের প্রথম ইশতেহার। রক্তই ভেঙে দেয় ভয়ের দেয়াল, জাগিয়ে তোলে ঘুমন্ত বিবেক। বিপ্লবের বিরূদ্ধে ছোড়া গুলি কেবল দেহ ভেদ করে না, বিপ্লবীদের স্বপ্নাতুরও করে তোলে। জনতাকে সিনা টান করে রাজপথে দাঁড়াবার সাহসে বলীয়ান করে তোলে। কবির কণ্ঠে শোনা যায়-
জুলাইয়ের রাজপথে
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে জনগণ।
ভয়কে পদদলিত করে
সামনে এগিয়ে গিয়েছে সবাই।
জনতার নিঃশ্বাসে কেঁপে উঠেছে
স্বৈরাচারের মসনদ।
সেদিন যারা জীবন দিয়েছে
শহীদ হয়েছে নির্দ্বিধায়,
সে সকল সাহসী বীর সন্তানদের নামই
আমাদের স্বাধীনতার মানচিত্র।
মাথা উঁচু বুকভরা ইতিহাস নিয়ে
জুলাইয়ের অগ্নিশপথে জন্ম নেবে
মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সম্পন্ন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। (রক্তই বিপ্লবের প্রথম ইশতেহার, পৃ. ২৪ )
একজন তরুণ কবির এর বেশি তীব্র বিপ্লবাকাঙ্ক্ষা আর কী হতে পারে?
বিপ্লব এবং বিপ্লবাকাঙ্ক্ষা কবির মজ্জাগত। কবি তার এ গ্রন্থের উৎসর্গ করেছেন জুলাই বিপ্লবের নেপথ্য ধারক, বিপ্লবে প্রাণ উজাড়কারী, সাহসী কণ্ঠযোদ্ধা, তরুন বুদ্ধিজীবী শহীদ শরীফ ওসমান হাদি-র স্মৃতির প্রতি বিনম্য শ্রদ্ধায়। সত্যিই তার স্মৃতি আজও আমাদের কাঁদায়। আমাদের ভাবায়। আমাদের শিহরিত করে। আন্দোলিত করে নব-প্রেরণায়। কবি তার বিপ্লব প্রেমের পরীক্ষায় আরো একবার উত্তীর্ণ।
কবি আরিফ হোসেন সবুজ তার এ গ্রন্থের সূচনা করেছেন জুলাই মানে মুক্তি কবিতা দিয়ে। ঠিক তারপরের কবিতার নাম মুক্তিকামী। ক্রমশ এগিয়ে চলেছেন মিছিল এবং কান্দে মায়ে কবিতার আঁচল ধরে। কান্দে মায়ে কবিতা কবির আবেগের অনিবার্য স্ফুরণ। কবি বলেন-
পুত হারিয়ে কান্দে মায়ে
ঝি হারিয়ে কান্দে,
মুখে তুলে খাইয়ে দিতে
এখনো ভাত রান্ধে।
আশায় বাসা ভাইঙ্গা গেল
লাশ হয়ে সে ফিরল,
জুলাই বীরের খাটিয়াটা
ধরতে সবাই ঘিরল। (কান্দে মায়ে, পৃ. ১৩ )
স্বৈরাচারের দোসর কর্তৃত্ববাদী সরকার তার বিরোধী মতের উপর যে ভয়াবহ নির্যাতনের স্টিম রোলার চালায় তার চিত্রাঙ্কনে কবি লিখেছেন আজাবনামা। দেশের মুক্তিকামী মানুষ আজাব মেনে নিয়েছে তবু মাথা শির নোয়ায়নি। শির উঁচিয়ে ঘোষণা করেছে-
মাথা উঁচু বাংলাদেশের
সন্তানেরা চলছে,
ভালোবাসি দেশের মাটি
সমস্বরে বলছে। (মাথা উঁচু বাংলাদেশ, পৃ. ১৫)
এভাবেই এগিয়ে চলেছে লাল জুলাইয়ের বিপ্লবীরা। ধর্মভেদ, বর্ণভেদকে তারা তোয়াক্কা করেনি। মানবতা তাদের কাছে ছিলো সব থেকে বড় বিষয়। নারী-পুরুষের বৈষম্য চিন্তা কবির কাছে ছিলো না। তাই কবি নারীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান অবলীলায়। কবি আরিফ হোসেন সবুজের শ্রদ্ধা নারীর প্রতি-
তুমি কভু মা জননী
তুমি কভু কন্যা,
থাকলে তুমি পরিবারে
বয় সুখেরই বন্যা। (নারী তোমায় শ্রদ্ধা, পৃ. ১৯)
এ কাব্যের সূচনায় তিনি বলেন-
নারী তোমায় শ্রদ্ধা জানাই
অনেক অনেক শ্রদ্ধা
জীবন নামক যুদ্ধে তুমি
বিজয়ী এক যোদ্ধা। (নারী তোমায় শ্রদ্ধা, পৃ. ১৯)
কবিতার বিশেষ ছন্দে কবি আরিফ হোসেন সবুজ রচনা করতে চান জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস। অবয়বে বড় নয় মর্মে সে অতিকায়। কবিতার সূচনা অত্যন্ত চমৎকার-
একটি জাতির বুক থেকে জ্বলে ওঠা দ্রোহের নাম জুলাই।
জুলাই ছিল জালিমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অগ্নি বিস্ফোরণ,
যেখানে রক্তের প্রতিটি ফোটা হয়ে উঠেছিল বজ্রধ্বনি,
আর মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছিল স্বাধীনতার শপথ। (জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস, পৃ. ২২ )
জুলাই বিপ্লবের বয়স দুই বৎসর হতে চললো। এরই মধ্যে আমরা ভুলতে বসেছি জুলাইয়ের রক্তাক্ত ইতিহাস। তাই বিপ্লবকে চিরন্তন করতে প্রশ্ন উঠেছে জুলাই সনদের। শুরু হয়েছে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। কবি আরিফ হোসেন সবুজ-এর মসি তখনই ঝলসে উঠেছে জুলাইয়ের স্বপক্ষে-
জুলাই সনদ আইনিভাবে
শক্তিশালী চাই,
বীর শহিদের বলছে মায়ে
মনে রেখ ভাই।
প্রতারণা করো যদি
পাবে না তো ছাড়
জীবন দিয়ে দেশ বাঁচাব
আমরা বারংবার। (জুলাই সনদ, পৃ. ২৬)
কবি আরিফ হোসেন সবুজের মসি বারবার আবর্তিত হয়েছে জুলাইকে ঘিরে। চব্বিশকে লক্ষ্য করে। সেই স্বাধীনতা-স্বাধিকার, সেই আবু সাঈদ-মুগ্ধ, সেই জুলাইয়ের মিছিল-শাটডাউন-বাংলা ব্লকেড, সেই জন্মভূমি আর এসব নিয়ে যত ছড়া আর কবিতা।
গোটা গ্রন্থ জুড়ে সকল কবিতাই প্রায় একমুখী। এর মধ্যে স্বৈরাচার কবিতাটি আমাদের সবিশেষ নজর কাড়ে। তবে মুক্তি কবিতাটি আমাদের মানসকে নাড়া দেয়-
ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়ে স্বৈরাচার ভুলে যায় পরিণামের কথা,
জনগণের উপর চালায় অমানবিক নির্যাতন
রাজপথ ভিজে যায় রক্তে
আর সেই রক্তই জন্ম দেয় বিপ্লবের নতুন ইতিহাস। (মুক্তি, পৃ. ৩৯ )
এরপরের কবিতা হাদি এখন কাজির সাথে এবং আবাবিলের আগুনমুখে কবিতাদ্বয় প্রকৃতই রোমাঞ্চকর। কবিতাদ্বয়ে দেশের মানসপটে শহীদানের চির-ভাস্বরতার স্বরূপ তুলে ধরেছেন কবি। স্বৈরাচারকে নিক্ষেপ করেছেন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। কবি বলেছেন-
স্বৈরাচারের আসন হলো
ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে,
লাল জুলাইয়ের বীর শহীদান
আছে সবার হৃদয় জুড়ে। (আবাবিলের আগুনমুখে, পৃ. ৪৩)
কবি আরিফ হোসেন সবুজ ছিলেন একজন জুলাই যোদ্ধা। রাজধানীর পিচঢালা কালো রাজপথ লালিম হতে দেখেছেন আপন চোখে। স্বৈরাচারের নির্মমতার স্বাক্ষী তিনি স্বয়ং। তাই সে ইতিহাসের অনিবার্য অংশ হবার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন সর্বদা।
মুছে ফেলো যতই স্মৃতি
যতই করো ‘নামটা’ নাই,
ইতিহাসের ভেতর তবু
কোথাও যেন থেকে যাই। (থেকে যাই, পৃ. ৪৮ )
এর মাধ্যমেই ছড়াকাব্যের যবনিকা টেনেছেন কবি আরিফ হোসেন সবুজ তার এ গ্রন্থের।
ছন্দের সারল্য, সাদামাটা শব্দের দ্যোতনা, জটিল শব্দের প্রয়োগহীনতা, সহজ শব্দ ও বাক্যের সদ্ব্যবহারে তিনি তার গ্রন্থটিকে করে তুলেছেন প্রাণবন্ত। গ্রন্থের প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি কবিতায় তিনি জুলাইকে এঁকেছেন গভীর মমতায়। দেশপ্রেমে সদা জাগ্রত কবি আরিফ হোসেন সবুজের গ্রন্থখানি কিশোর-তরুন মনে দেশপ্রেমের ঝড় তুলতে পুরোপুরি সক্ষম বলে আমরা মনে করি। তিন ফর্মার আটচল্লিশ পৃষ্ঠার আকর্ষণীয় প্রচ্ছদে প্রকাশিত জুলাই মানে মুক্তি বইটি যুব সমাজের প্রয়োজনেই বহুল প্রচার হওয়া সময়ের দাবি। কবির প্রতি লাল গোলাপের একরাশ প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
লেখক: চেয়ারম্যান, চারুকলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।